আদর্শ শিক্ষকের জন্য প্রত্যাশা
আমি নিজে একজন মাস্টার। ‘শিক্ষক' শব্দটা অনেক ভারী, লোকে মাস্টারই বলে। জীবিকার জন্য আমি মাস্টারি করেছি। জীবিকাই হচ্ছে মানুষের জীবনের আশ্রয়। মাস্টারি করেই আমি জীবিকা নির্বাহ করেছি। তবে অন্য মাস্টারি না-করে অন্যকিছুও তো করতে পারতাম। কিন্তু আমি অন্য কিছু করতে চাইনি। মাস্টারি করতে চেয়েছি, এবং মাস্টারিটাকেই আমার জীবন ও জীবিকার অবলম্বন করে নিয়েছি। মাস্টারি করেই আমি পরিপূর্ণ সুখী। হ্যাঁ, ‘সুখী’ শব্দটাই ব্যবহার করতে চাই আমি।
মাস্টারি ছাড়া যদি অন্য কিছু করতাম, তাহলে আমার জীবিকার মধ্য দিয়ে জীবনের স্বস্তি ও তৃপ্তি আমি পেতে পারতাম বলে মনে করি না। আমার সৌভাগ্য যে আমি মাস্টার হতে চেয়েছিলাম, মাস্টারই হতে পেরেছি। ছেলেবেলাতেই কী করে জানি কিছু আদর্শের পোকা আমার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। তবু, স্কুলে পড়ার সময়েই রবীন্দ্রনাথের ‘একরাত্রি' গল্পটা পড়ে সেই আদর্শ গুলোকে সামলে রাখার প্রয়োজনটাও উপলব্ধি করেছিলাম। যদিও জীবিকার ক্ষেত্রে মাস্টার হওয়াটাই আমার জীবনের লক্ষ্য ছিল, তবু ‘একরাত্রি’ গল্পটি থেকেই শিখেছিলাম যে আমি যে সকল আদর্শের কথা ভাবি তা ক্লাসরুমে ছাত্রদের কাছে প্রচার করা যাবে না। ক্লাসে আদর্শের প্রচার করলে আমর মাস্টারি টিকবে না।
‘একরাত্রি’ গল্পের নায়ক কলকাতায় লেখাপড়া করতে গিয়ে পরাধীন ভারতকে স্বাধীন করার আদর্শবাদের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্য সব ভাবনাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ পিতার মৃত্যু-সংবাদ পেয়ে তার ভাবনায় ছন্দ পতন ঘটে গেল। আদর্শের চেয়ে বাস্তব অনেক বেশি কঠোরতা নিয়ে তার সামনে এসে হাজির হলো। নায়কের নিজের জবানিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
“এন্ট্রেন্স পাস করিয়াছি, ফার্স্ট আর্টস দিব, এমন সময় পিতার মৃত্যু হইল। সংসারে কেবল আমি একা নই; মাতা এবং দুটি ভগিনী আছে। সুতরাং কলেজ ছাড়িয়া কাজের সন্ধানে ফিরিতে হইল। বহু চেষ্ঠায় নওয়াখালি বিভাগের একটি ছোট শহরে এন্ট্রেন্স স্কুলের সেকেন্ড মাস্টারি পদ প্রাপ্ত হইলাম।
মনে করিলাম, আমার উপযুক্ত কাজ পাইয়াছি। উপদেশ এবং উৎসাহ দিয়া এক একটি ছাত্রকে ভাবী ভারতের এক-একটি সেনাপতি করিয়া তুলিব। কাজ আরম্ভ করিয়া দিলাম। দেখিলাম, ভাবী ভারতবর্ষ অপেক্ষা আসন্ন এগ্জামিনের তাড়া ঢের বেশি। ছাত্রদিগকে গ্রামার অ্যালজেব্রার বহির্ভূত কোনো কথা বলিলে হেডমাস্টার রাগ করে। মাস দুয়েকের মধ্যে আমারও উৎসাহ নিস্তেজ হইয়া আসিল।
আমাদের মতো প্রতিভাহীন লোক ঘরে বসিয়া নানারূপ কল্পনা করে, অবশেষে কার্যক্ষেত্রে নামিয়া ঘাড়ে লাঙ্গল বহিয়া পশ্চাৎ হইতে ল্যাজ্যামলা খাইয়া নতশিরে সহিষ্ণুভাবে প্রাত্যহিক মাটিভান্ডার কাজ করিয়া সন্ধ্যাবেলার একপেট জাবনা খাইতে পাইলেই সন্তুষ্ট থাকে; লঙ্কে-ঝম্পে আর উৎসাহ থাকে না।”
মাস্টারি করে যে 'ভারত উদ্ধার' করা যাবে না, এবং ক্লাসে গ্রামার অ্যালজাব্রার বহির্ভূত কোনো কথা বললে যে হেডমাস্টার বা প্রিন্সিপাল রাগ করেন তা আমি ‘একরাত্রি' গল্প থেকেই শিখে নিয়েছিলাম, এবং মাস্টারি জীবনে সেই শিক্ষা সব সময় মনে রেখেছি। কাজেই মাস্টারি করতে এসে আমি মাস্টারিই করেছি। সুতরাং কোনো হেডমাস্টার বা প্রিন্সিপাল আমার উপর রাগ করতে পারেন নি। তবে ব্যক্তিগত ভাবে এতে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। কী করে এর ভেতর দিয়েই আমার ললিত আদর্শ গুলোকে ছাত্রদের মধ্যে চারিয়ে দেয়া যায় তার ফাঁকাফোকর খুঁজে নিয়েছি। এর কারণ, ছেলেবেলায় এমন কিছু মাস্টারের কাছে আমি পড়েছি যাঁরা সত্যিকারের আদর্শ মাস্টার ছিলেন। সে-সময়ে, অন্তত আমাদের পাড়াগাঁয়ে, মাস্টারের আদর্শ বজায় রাখার মতো অবস্থা কিছুটা হলেও বিদ্যমান ছিল। আমাদের গাঁয়ের স্কুলে আমি জয়চন্দ্র রায়ের মতো শিক্ষক পেয়েছি। তিনি ক্লাসে আমাদের প্রায় সব বিষয়েই পড়াতেন। সেই পাকিস্তান আমলের গোড়ার দিকে গ্রামের স্কুলগুলোর অবস্থা ছিল খুবই করুণ। হিন্দু শিক্ষকদের অনেকেই দেশত্যাগ করেছেন। শিক্ষিত মুসলমানরা তখন সহজেই অন্য চাকুরি পেয়ে যেতেন, গাঁয়ের স্কুলের মাস্টার হতে চাইতেন না।
এ-রকমই একটি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments